একচেটিয়া রাজত্বে চড়া চার্জ: দিশেহারা বিকাশ গ্রাহক?
- আপডেট সময় : ১১:৪০:০৭ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর ২০২৬
- / 96
বাংলাদেশে ক্যাশলেস বা ডিজিটাল আর্থিক সেবার (MFS) ব্যাপক প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠেছে মোবাইল ব্যাংকিং। তবে সহজ সেবার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বাজারজাতকরণ করা হলেও, বর্তমানে দেশের শীর্ষ MFS প্ল্যাটফর্ম ‘বিকাশ’-এর চড়া সেবামাশুল বা চার্জ ব্যবস্থা নিয়ে সারা দেশের সাধারণ গ্রাহক, শিক্ষার্থী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
জরুরি দরকারে সামান্য লেনদেন করতে গেলেও নানা শর্তের বেড়াজালে পড়ে মূল অঙ্কের উল্লেখযোগ্য অংশই মাশুল হিসেবে হাতছাড়া হচ্ছে গ্রাহকের। ক্যাশলেস বাংলাদেশ গড়ার সরকারি লক্ষ্যমাত্রার সুযোগ নিয়ে এভাবে সাধারণ মানুষের পকেট থেকে কোটি কোটি টাকা অতিরিক্ত মাশুল আদায় করা হচ্ছে কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।
সেন্ড মানিতে অদৃশ্য খরচের চাপ
স্বজন বা পরিচিতদের কাছে টাকা পাঠানোর (Send Money) ক্ষেত্রে সাধারণ লেনদেনে বিকাশের মাশুল নীতি প্রতিযোগী অন্যান্য অ্যাপের তুলনায় যথেষ্ট ব্যয়বহুল:
* বিকাশ (bKash): বিকাশ অ্যাপে প্রতি মাসে সীমিত সংখ্যক (৫টি) ‘প্রিয় নম্বর’-এ ২৫,০০০ টাকা পর্যন্ত লেনদেনে অতিরিক্ত ফি না থাকলেও, এই সীমার বাইরে সাধারণ যেকোনো নম্বরে টাকা পাঠাতে গেলেই যুক্ত হয় উচ্চ মাশুল। বিশেষ করে ১০০ টাকার মতো ক্ষুদ্র অঙ্কের লেনদেনে ক্ষেত্রবিশেষে ১০ টাকা পর্যন্ত সার্ভিস চার্জ কাটার উদাহরণ রয়েছে, যা শতকরা হিসেবে মূল টাকার প্রায় ১০ শতাংশ!
* নগদ (Nagad): ডাক বিভাগের সেবা ‘নগদ’-এর অ্যাপ ব্যবহার করে নিয়মিত লেনদেনে সেন্ড মানি মাশুল সম্পূর্ণ ফ্রি (নির্দিষ্ট সরকারি সীমা অনুযায়ী)।
* রকেট (Rocket): ডাচ-বাংলা ব্যাংকের ‘রকেট’ অ্যাপ বা ইউএসএসডি কোডের মাধ্যমে সাধারণ সেন্ড মানিতে নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত সার্ভিস চার্জ শূন্য অথবা অত্যন্ত নামমাত্র।
ক্যাশ আউট চার্জের চড়া হার
টাকা উত্তোলনের (Cash Out) ক্ষেত্রেও অন্যান্য সেবার তুলনায় বিকাশের ফি সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে:
* বিকাশ: সাধারণ এজেন্টের মাধ্যমে ক্যাশ আউট করতে গেলে বিকাশ গ্রাহককে প্রতি হাজারে সর্বোচ্চ ১৮.৫০ টাকা পর্যন্ত চার্জ দিতে হয় (প্রিয় এজেন্ট ছাড়া)।
* নগদ: অ্যাপের মাধ্যমে নগদে ক্যাশ আউট চার্জ হাজারে ১৪.৯০ টাকা, যা বাজারের সর্বনিম্ন হারের একটি।
* রকেট: এজেন্টের মাধ্যমে উত্তোলনে রকেটের চার্জ হাজারে প্রায় ১৬.৭০ টাকা।
বাজারের সিংহভাগ গ্রাহক ভিত্তি (Market Share) নিয়ন্ত্রণে রাখার সুযোগে বিকাশ তাদের সর্বোচ্চ চার্জ নীতি বজায় রেখেছে বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
প্রান্তিক মানুষ ও ডিজিটাল অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি
প্রযুক্তির আধুনিকায়নে যেখানে সেবা পাওয়ার খরচ কমার কথা, সেখানে এই উচ্চ মাশুলের কারণে দেশের তৃণমূল অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে:
১. ক্ষুদ্র ও ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের দুর্ভোগ: এফ-কমার্স ও খুচরা ব্যবসায়ীরা অতিরিক্ত লেনদেন মাশুলের কারণে পণ্যের চূড়ান্ত দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন।
২. ডিজিটাল বিমুখতা: মাত্রাতিরিক্ত খরচের কারণে সাধারণ মানুষ ডিজিটাল লেনদেনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে আবার ঝুঁকি নিয়ে নগদ টাকা (Cash) ব্যবহারের সনাতন অভ্যাসে ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছে।
৩. নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন: বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত ফি-ক্যাপ বা সর্বোচ্চ সীমার পূর্ণ সুযোগ নিয়ে কেন গ্রাহকদের ওপর এভাবে সর্বোচ্চ চার্জ চাপিয়ে রাখা হচ্ছে—তা নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি ব্যবস্থার ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ।
প্রযুক্তির বিকাশের দোহাই দিয়ে সাধারণ গ্রাহকদের ওপর অতিরিক্ত ফি-র বোঝা চাপিয়ে কোটি কোটি টাকা সংগ্রহের নীতি কতটা যৌক্তিক এবং এতে দেশের মূল অর্থনীতির কতটা ক্ষতি হচ্ছে—তা নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে।
(প্রতিবেদকের বিশেষ নোট: অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের এই পর্বে উপস্থাপিত বিষয়াবলী ও গ্রাহক অসন্তোষের বিষয়ে বিকাশ কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া গেলে পরবর্তী প্রতিবেদনে তা প্রকাশ করা হবে।)




























