ঢাকা ১১:১১ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৯ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চলমান যুদ্ধের থাবা:

বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল ছাড়াল ১০০ ডলার

আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৬:১৯:২৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / 22

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চলমান যুদ্ধ আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতিতে নেতিবাচক থাবা বসিয়ে যাচ্ছে। এই থাবায় সবচেয়ে বেশি টালমাটাল হয়ে পড়ছে তেলের বাজার। বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলা এবং এরইমধ্যে ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের হামলার প্রেক্ষাপটে তেলের বাজারে এ অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

বিবিসির প্রতিবেদন বলছে, বুধবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। গত জুলাইয়ের পর এই প্রথম বৈশ্বিক তেলের দাম এ পর্যায়ে পৌঁছায়। যদিও বেলা শেষে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম কিছুটা কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৯ দশমিক ৯০ ডলারে নেমে আসে। ব্রেন্ট ক্রুড আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের প্রধান মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়।

তবে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে তেলের দাম আবারও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গত জুলাইয়ের শেষ দিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে তেলের বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। আগের দিন সোমবার পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যে তেহরান একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করার পর প্রতিশোধমূলক হামলায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পাঁচটি তেল ট্যাংকারে আঘাত হানে।

পরদিন মঙ্গলবার ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি আন্দোলনও সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় হামলা চালায়। পাশাপাশি তারা লোহিত সাগরে তেল ট্যাংকার লক্ষ্য করে হামলা অব্যাহত রেখেছে।

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর শুরু হওয়া সংঘাতের ছয় মাসেরও বেশি সময় পর নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেল। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যাপক ওঠানামা করছে। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত আঞ্চলিক অস্থিরতা তেলশিল্পের ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছে।

সংঘাত শুরুর আগে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭০ ডলার। তবে যুদ্ধের কারণে কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়।

তেলের দাম বাড়ায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পেট্রোলের দামও দ্রুত বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর।

যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসির সঙ্গে সম্পর্কিত ওমান উপসাগরে অবস্থানরত চারটি ইরানি ট্যাংকার এবং খার্গ দ্বীপের কাছে থাকা আরও একটি ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এর জবাবে তেহরান জর্ডানে অবস্থিত একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। তবে বেশির ভাগ ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

ইরান আরও দাবি করেছে, তারা হরমুজ প্রণালিতে দুটি মার্কিন জাহাজ এবং আটটি তেল ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে। গত জুলাইয়ে নিজেদের অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে হুতি ও সৌদি আরবের মধ্যেও পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে।

সোমবার হুতিরা অভিযোগ করে, সৌদি আরব আল-হাজম শহরের একটি কারাগারে বোমা হামলা চালিয়ে ১১ জনকে হত্যা করেছে। এর পর মঙ্গলবার সৌদি কর্তৃপক্ষ জানায়, হুতিরা আবহা, খামিস মুশাইত, জাজান ও নজরান শহরের বেসামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।

সাম্প্রতিক এই উত্তেজনা আরও বেড়ে যায় ইরান একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে লক্ষ্যবস্তু করার পর। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম জানায়, ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সফলভাবে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে এবং হামলায় কোনো মার্কিন সেনা আহত হয়নি।

এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র জানায়, তারা যেসব পাঁচটি ইরানি তেল ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে, সেগুলো একটি বহু-বিলিয়ন ডলারের তথাকথিত গোপন নেটওয়ার্কের অংশ, যা আইআরজিসি এবং তাদের আঞ্চলিক সহযোগী গোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়ন করে।

যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজগুলোর একটি এম/টি রিসকো পরে ওমান উপসাগরে ডুবে যায় বলে সেন্টকম জানিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজটির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশ করা হয়।

সাম্প্রতিক মার্কিন হামলায় লক্ষ্যবস্তু হওয়া খার্গ দ্বীপে ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি টার্মিনাল অবস্থিত। দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল মূল ভূখণ্ড থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে এই দ্বীপে পৌঁছায় এবং সেখান থেকে রপ্তানি করা হয়।

এদিকে মঙ্গলবার ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি আন্দোলন সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনা ও বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালায়। সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, এসব হামলায় ৭৩ জন আহত হয়েছেন।

সৌদি সামরিক বাহিনী ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে তেল স্থাপনা ও বিভিন্ন অবকাঠামোতে আগুন লাগে। এর ফলে কিছু স্থাপনায় সাময়িকভাবে কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

চলমান যুদ্ধের থাবা:

বিশ্ববাজারে তেলের দাম ব্যারেল ছাড়াল ১০০ ডলার

আপডেট সময় : ০৬:১৯:২৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চলমান যুদ্ধ আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতিতে নেতিবাচক থাবা বসিয়ে যাচ্ছে। এই থাবায় সবচেয়ে বেশি টালমাটাল হয়ে পড়ছে তেলের বাজার। বুধবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে পাল্টাপাল্টি হামলা এবং এরইমধ্যে ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের হামলার প্রেক্ষাপটে তেলের বাজারে এ অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

বিবিসির প্রতিবেদন বলছে, বুধবার ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১০০ ডলারের ওপরে উঠে যায়। গত জুলাইয়ের পর এই প্রথম বৈশ্বিক তেলের দাম এ পর্যায়ে পৌঁছায়। যদিও বেলা শেষে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম কিছুটা কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৯ দশমিক ৯০ ডলারে নেমে আসে। ব্রেন্ট ক্রুড আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের প্রধান মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়।

তবে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে তেলের দাম আবারও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গত জুলাইয়ের শেষ দিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে তেলের বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। আগের দিন সোমবার পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যে তেহরান একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করার পর প্রতিশোধমূলক হামলায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পাঁচটি তেল ট্যাংকারে আঘাত হানে।

পরদিন মঙ্গলবার ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি আন্দোলনও সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় হামলা চালায়। পাশাপাশি তারা লোহিত সাগরে তেল ট্যাংকার লক্ষ্য করে হামলা অব্যাহত রেখেছে।

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর পর শুরু হওয়া সংঘাতের ছয় মাসেরও বেশি সময় পর নতুন করে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেল। যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যাপক ওঠানামা করছে। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত আঞ্চলিক অস্থিরতা তেলশিল্পের ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছে।

সংঘাত শুরুর আগে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ছিল ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৭০ ডলার। তবে যুদ্ধের কারণে কার্যত হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়ে পরিবহন করা হয়।

তেলের দাম বাড়ায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পেট্রোলের দামও দ্রুত বেড়েছে, যার প্রভাব পড়েছে সাধারণ ভোক্তাদের ওপর।

যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসির সঙ্গে সম্পর্কিত ওমান উপসাগরে অবস্থানরত চারটি ইরানি ট্যাংকার এবং খার্গ দ্বীপের কাছে থাকা আরও একটি ট্যাংকার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এর জবাবে তেহরান জর্ডানে অবস্থিত একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। তবে বেশির ভাগ ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

ইরান আরও দাবি করেছে, তারা হরমুজ প্রণালিতে দুটি মার্কিন জাহাজ এবং আটটি তেল ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে। গত জুলাইয়ে নিজেদের অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর থেকে হুতি ও সৌদি আরবের মধ্যেও পাল্টাপাল্টি হামলা চলছে।

সোমবার হুতিরা অভিযোগ করে, সৌদি আরব আল-হাজম শহরের একটি কারাগারে বোমা হামলা চালিয়ে ১১ জনকে হত্যা করেছে। এর পর মঙ্গলবার সৌদি কর্তৃপক্ষ জানায়, হুতিরা আবহা, খামিস মুশাইত, জাজান ও নজরান শহরের বেসামরিক ও অর্থনৈতিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।

সাম্প্রতিক এই উত্তেজনা আরও বেড়ে যায় ইরান একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে লক্ষ্যবস্তু করার পর। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড বা সেন্টকম জানায়, ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সফলভাবে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয়েছে এবং হামলায় কোনো মার্কিন সেনা আহত হয়নি।

এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র জানায়, তারা যেসব পাঁচটি ইরানি তেল ট্যাংকারে হামলা চালিয়েছে, সেগুলো একটি বহু-বিলিয়ন ডলারের তথাকথিত গোপন নেটওয়ার্কের অংশ, যা আইআরজিসি এবং তাদের আঞ্চলিক সহযোগী গোষ্ঠীগুলোকে অর্থায়ন করে।

যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজগুলোর একটি এম/টি রিসকো পরে ওমান উপসাগরে ডুবে যায় বলে সেন্টকম জানিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত জাহাজটির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশ করা হয়।

সাম্প্রতিক মার্কিন হামলায় লক্ষ্যবস্তু হওয়া খার্গ দ্বীপে ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি টার্মিনাল অবস্থিত। দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল মূল ভূখণ্ড থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে এই দ্বীপে পৌঁছায় এবং সেখান থেকে রপ্তানি করা হয়।

এদিকে মঙ্গলবার ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি আন্দোলন সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনা ও বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলা চালায়। সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, এসব হামলায় ৭৩ জন আহত হয়েছেন।

সৌদি সামরিক বাহিনী ও জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে তেল স্থাপনা ও বিভিন্ন অবকাঠামোতে আগুন লাগে। এর ফলে কিছু স্থাপনায় সাময়িকভাবে কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হয়।